বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া কি এবং বাজারজাতকরণের গুরুত্ব আলোচনা কর

  

বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া কি

বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া কি

বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া হলো পাঁচ স্তরবিশিষ্ট এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বাজারের অবস্থান নির্ণয়  ক্রেতাদের চাহিদা নির্ধারণক্রেতা কর্তৃক পরিচালিত বাজারজাতকরণ কৌশল ডিজাইনসমন্বিত বাজার প্রোগ্রাম গঠনক্রেতাদের সাথে সুবিধাজনক সম্পর্ক তৈরিক্রেতা সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রতিষ্ঠানের অধিক মুনাফা অর্জন এবং ক্রেতা ইক্যুইটি ধরে রাখার চেষ্টা করে।

নিম্নে চিত্রের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ দেখানো হলো

চিত্র: বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার একটি সরল মডেল।
চিত্রবাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার একটি সরল মডেল।

উপরের চিত্রে দেখা যায়প্রথম চারটি স্তরে কোম্পানি ভোক্তাদের অনুধাবন, ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি এবং ক্রেতার সাথে সুসম্পর্ক তৈরির জন্য কাজ করে। আর সর্বশেষ স্তরে মুনাফা  ক্রেতা ইক্যুইটি সৃষ্টির মাধ্যমে ভ্যালু বা সুবিধা অর্জন করে।

Sources: Philip Kotler & Gary Armstrong, Principles of Marketing 13 th edn. 2010. P-5.

বাজারজাতকরণের গুরুত্ব

বাজারজাতকরণ হলো লাভজনক উপায়ে ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধানের বিজ্ঞান ও কলা। বাজারজাতকরণ তার কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের উপযোগ সৃষ্টি করে। যেমন- সময়গত, স্থানগত, মালিকানাগত, তথ্যগত ও ভাবমূর্তিগত উপযোগ। এসব উপযোগের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ হতে ভোক্তার প্রত্যাশা পূরণ হয়। তাই বাজারজাতকরণ মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যা সারা জীবন ব্যাপী বিস্তৃত। নিম্নে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাজারজাতকরণের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো।

ক. অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic significance)

১. পণ্য ও সেবা উৎপাদন (Producing goods and services) : বাজারজাতকরণ মানুষের প্রয়োজন, অভাব ও চাহিদা শনাক্ত করে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে। উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিক ভোক্তার জন্য সঠিক পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখে।

২. চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতা বিধান (Equilibrium in demand & supply) : বাজারজাতকরণ ভোক্তার কোন পণ্য, কী পরিমাণ, কখন প্রয়োজন তা অনুধাবন করে উৎপাদনকারী বা বাজারজাতকারীকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়। আর উৎপাদনকারী সে অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা করে। অর্থাৎ ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের যোগান নিশ্চিত করা হয়। এতে করে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩. বৃহদায়তন উৎপাদন (Large-scale production) : বাজারজাতকরণ বিভিন্ন প্রসারমূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে শুধু দেশের ভিতরেই নয়, দেশের বাইরেও পণ্যের বাজার সৃষ্টি করে। আর বাড়তি চাহিদার ফলে প্রয়োজন হয় বৃহদায়তন উৎপাদন। যা পণ্যের একক প্রতি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে। ফলে ভোক্তা স্বল্প মূল্যে পণ্য ভোগ করতে পারে। এতে করে বিক্রির পরিমাণও বেড়ে যায়। আর যতই পণ্য বিক্রি হবে ততই উৎপাদনের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

৪. সুষ্ঠু বণ্টন (Proper distribution) : উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে ঘাটতি অঞ্চলে পণ্য প্রেরণ এবং উৎপাদন স্থল থেকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বাজারজাতকরণ তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে সুষ্ঠু বণ্টনে বাজারজাতকরণ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেমন- বরিশালের ইলিশ মাছ দেশ বিদেশের ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ করছে।

৫. উপযোগ সৃষ্টি (Creating utility) : কোন পণ্য বা সেবার প্রয়োজন পূরণের ক্ষমতাই হলো উপযোগ। বাজারজাতকরণ পণ্যের রূপগত, স্বত্বগত, সময়গত ও স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি করে। যেমন- আম থেকে জুস, স্কোয়াশ, চাটনি ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। আবার শীতকালের আলু সারা বছর ধরে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ইত্যাদি।

৬. চাহিদা সৃষ্টি ও চাহিদা বৃদ্ধি (Creating and increasing demand) : নতুন পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে কিংবা বিদ্যমান পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে বাজারজাতকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাজারজাতকরণের বিভিন্ন প্রসারমূলক কার্যক্রম যেমন—বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে ভোক্তাকে পণ্য ক্রয়ে আকৃষ্ট ও প্ররোচিত করা হয়। এতে পণ্যের চাহিদা বাড়ে।

৭. কৃষি ও শিল্পের সুষম উন্নয়ন (Balanced growth of agriculture and industry) : বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী শিল্প-কারখানা-কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদিত সার, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি কৃষিক্ষেত্রে সরবরাহ করা হয়। এতে কৃষি ও শিল্পের সুষম উন্নয়ন সাধিত হয়।

৮. ব্যবসায়িক ঝুঁকি হ্রাস (To reduce business risks) : ব্যবসায় মানেই হলো এক ধরনের ঝুঁকি। উৎপাদনকারীর কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকি বিদ্যমান। যেমন- পরিবহন ও গুদামজাতকরণজনিত ঝুঁকি, ফ্যাশন ও মূল্য পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ইত্যাদি। ব্যবসায়িক ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য বাজারজাতকারী অনেক সময় পণ্যের মালিকানা গ্রহণ করে। এর ফলে ব্যবসায়িক ঝুঁকি হ্রাস পায়।

৯. বাজার সম্প্রসারণ (Market expansion): বাজারজাতকরণ কার্যক্রম নতুন নতুন ভোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি করে এবং প্রচলিত পণ্যের বর্তমান বাজার সম্প্রসারণ করে। এভাবে বাজারজাতকরণ ব্যবসায় বাণিজ্যে গতিশীলতা এনে বাজার সম্প্রসারণে সাহায্য করছে।

১০. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার (Proper utilization of resources): বাজারজাতকরণ কার্যক্রমের ফলে অব্যবহৃত সম্পদেরও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হয়। যেমন- সৌর বিদ্যুৎ, গরুর গোবর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শস্যক্ষেতে মৌমাছি পালন করে মধু আহরণ ইত্যাদি নতুন নতুন চিন্তাধারা বাজারজাতকরণ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করে তুলেছে।

১১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Economic development): দক্ষ বাজারজাতকরণের ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ, আয়, সঞ্চয়, ভোগ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ইত্যাদি বেড়ে যায়। যে দেশ বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় যত উন্নত সে দেশ ততই অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। তাছাড়া অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাজারজাতকরণের ভূমিকা অপরিসীম।

খ. সামাজিক গুরুত্ব (Social significance)

১. কর্মসংস্থান (Employment) : বাজারজাতকরণের বিভিন্ন কার্যক্রম, যেমন- ক্রয়, বিক্রয়, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, মান নির্ধারণ, বিজ্ঞাপন, প্যাকেজিং ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করতে অসংখ্য লোক নিয়োগ করতে হয়। তাছাড়াও বাজারজাতকরণ কৃষি ও শিল্পে নতুন নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।

২. জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন (Improving standard of living) : মার্কিন গবেষক ও বাজারজাতকরণ বিশেষজ্ঞ Paul Mazur ১৯৪৭ সালে সর্বপ্রথম 'Furtune' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেখান যে, "Marketing is the delivery of standard of living to society." অর্থাৎ, বাজারজাতকরণ সমাজে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক। বিভিন্নভাবে বাজারজাতকরণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করে। যেমন- ভোক্তাকে দেশ-বিদেশে উৎপাদিত উন্নতমানের পণ্য ভোগ করার সুযোগ করে দিয়ে, দেশের উদ্বৃত্ত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বৃহদায়তন উৎপাদন ব্যবস্থার প্রবর্তনে পণ্যের মূল্য হ্রাস করে, পণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করে, নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে বাজারজাতকরণ আমাদের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করছে।

৩. প্রতিযোগিতার সুফল (Advantages of competition) : বিশ্বব্যাপী বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য উৎপাদকরা তাদের পণ্যের গুণ, মান, বৈশিষ্ট্য উন্নত করে। অনেক সময় প্রতিযোগিতার কারণে পণ্য মূল্য হ্রাস পায়। যার ফলে ভোক্তারা কম দামে উন্নত মানের পণ্য ভোগ করতে পারে।

৪. ভোক্তার সন্তুষ্টি বিধান (Consumer satisfaction) : বাজারজাতকারী ভোক্তার প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করে। আর এসব পণ্যসামগ্রী ক্রয় ও ভোগ করার মাধ্যমে ভোক্তা তার চাহিদার সন্তুষ্টি বিধান করে থাকে।

৫. শিল্পায়ন (Industrialization): বাজারজাতকরণ ভোক্তাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য ও সেবার মাধ্যমে অধিক ভোগে উৎসাহিত করে। এতে পণ্যের চাহিদা ও বিক্রয় বৃদ্ধি পায়। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি ও শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে। এছাড়াও নতুন নতুন উদ্যোক্তারা শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসে। বাজারজাতকরণ এভাবে শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

৬. স্বল্পমূল্যে পণ্য ভোগ (Consumption of products at a low price) : বাজারজাতকরণ কার্যক্রম এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, প্রতিনিয়ত উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে পণ্যের একক মূল্য হ্রাস পায়। এছাড়াও রয়েছে প্রতিযোগিতার সুফল। এর ফলে ভোক্তারা স্বল্পমূল্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের পণ্য ক্রয় ও ভোগ করতে পারছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ